পঞ্চগড়ের জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার ডা. রহমতুল্লাহর বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা করে ৪ প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া বিএমডসি অনুমোদিত নয় এমন ডিগ্রি ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করার অভিযোগ রয়েছে।
জানা যায়, তিনি মেডিকেল অফিসার হিসেবে জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ে কর্মরত হয়েও একই সাথে ভারপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালক (ক্লিনিক্যাল), সংযুক্তিতে বোদা উপজেলা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের মেডিকেল অফিসার, বোদা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার (তার স্ত্রী ডা.মোমেনা বেগমের পরিবর্তে) ও ফ্যামিলি কেয়ার ল্যাব এর শেয়ারহোল্ডার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো একাই সামলাচ্ছেন।
রবিবার (১৫ মার্চ) বোদা উপজেলায় মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে দুপুর ২ টায় দেখা যায় গীতা রাণী নামের একজন পরিদর্শিকা ও মোর্শেদা খাতুন নামে একজন ডাইনার্স ছাড়া কেউ উপস্থিত নেই। ডা. রহমতুল্লাহর রুমে তালা না থাকলেও তিনি অনেক আগেই বেরিয়েছেন বলে জানা যায়। অন্যান্য সকল রুম ছিল তালাবদ্ধ। মুঠোফোনে ডাক্তার রহমতুল্লাহর অবস্থান জানতে চাইলে বাইরে আছি বলে উল্টো প্রশ্ন ছুড়ে দেন ‘কি সমস্যা বলেন’? পরে দুজন ছাড়া টেকনোলজিস্ট সহ অফিস স্টাফদের অনুপস্থিতির কথা জানালে ব্যস্ত আছি বলে লাইন কেটে দেন। আবার চেষ্টা করেও তিনি আর ফোন রিসিভ করেন নি।
এদিকে ভুক্তভোগী অনেকেই বলছেন মাতৃসদনে তেমন কোন সেবাই পাওয়া যায়না। বোদা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে চিকিৎসক দেখাতে এলে ডা. রহমতুল্লাহ ব্যক্তিগত চেম্বার ফ্যামেলি কেয়ার ল্যাব এ নিয়ে যেতে বলেন। এবং তার পছন্দ সই ডায়াগনোসিস শেষে পছন্দের ক্লিনিকে সিজার অপারেশন করতে বাধ্য করান। অন্য কোন ক্লিনিকে নিতে চাইলে তিনি রীতিমতো বাধ সাধেন এবং রোগীর লোকজনের সাথে দুর্ব্যবহার করতে দ্বিধা করেন না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে চন্দনবাড়ী ইউনিয়নের একজন ভুক্তভোগী নারী জানান, কিছুদিন আগে ডা. রহমতুল্লাহর কাছে গেলে তিনি ফ্যামিলি কেয়ার ল্যাব এ পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে মর্ডান ক্লিনিকে সিজার অপারেশন করতে পরামর্শ দেন। আমরা পরিবারের সাথে কথা বলে নিরাময় নার্সিং হোমে করতে চাইলে তিনি প্রথমে নিষেধ করেন। আমরা নিজের সুবিধার্থে নিরাময় ক্লিনিকে সিজার করাবো জানালে তিনি তার পছন্দের ডাক্তার ছাড়া যেন অপারেশন না করি সেদিকে জোর দিতে থাকেন। কিন্তু নিরাপত্তার কথা ভেবে আমরা পরে গাইনি বিশেষজ্ঞ রেজা ডাক্তার এর মাধ্যমে অপারেশন সম্পন্ন করি। এতে তিনি ক্রুদ্ধ হোন।
একই ব্যক্তি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের ডাক্তার আবার বোদা হাসপাতালেও বউয়ের বদলী ডাক্তার হিসেবে রহমতুল্লাহ কিভাবে ডিউটি করেন জানতে চাইলে বোদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা ডাক্তার লুতফুল কবির বলেন, সিভিল সার্জন সব জানেন তিনি ওর্ডার করলে আজই বাতিল করে দেবো।
পঞ্চগড় জেলা সিভিল সার্জন এর কাছে, একই ডাক্তারের দুই টি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে ডিউটি করার নিয়ম আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি জানান, উনার বউ মোমেনা বোদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডাক্তার হিসেবে কর্মরত, ছোট বাচ্চা থাকার ফলে মানবিক কারনে এই অনুমতি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এতদিন থাকার কথা নয় যদি থাকে সেটা আজই বাতিলের নির্দেশনা দেয়া হবে।
পঞ্চগড় জেলা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের ডিডি বলেন, উনার ব্যাপারে এর আগেও এরকম শুনেছি। তিনি মুলত মেডিকেল অফিসার হিসেবে পঞ্চগড়ে কর্মরত। একিই সাথে সিনিয়র একজন ডাক্তার অবসরে যাওয়ায় ভারপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালক (ক্লিনিক্যাল) হিসেবে পুরো জেলায় দায়িত্ব পালন করছেন। একইভাবে তিনি বোদা উপজেলা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের দায়িত্ব পালন করছেন সংযুক্তি তে। তিনি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও স্ত্রীর পরিবর্তে ডিউটি করার বিষয় টি শুনেছি। ডাক্তার রা পারসোনাল চেম্বার করেন কিন্তু মালিকানা নিয়ে ডায়গনস্টিক সেন্টার খুলে সরকারি চাকুরী অবস্থায় করতে পারবেননা। তিনি ন্যামপ্লেটে ডিস্ট্রিক্ট কনসালটেন্ট লিখে থাকলে আইনত ভূল করেছেন।
এদিকে ২০২৪ সাল থেকে এতগুলো দায়িত্ব একাই কিভাবে পালন করছেন জানতে চাইলে ডা. রহমতুল্লাহ বলেন আমি কোন অনিয়ম করিনি। ডিস্ট্রিক্ট কনসালটেন্ট আগে ঠিক ছিলো তবে এখন প্রজেক্ট না থাকায় লিখা ঠিক হয়নি সেটি নামিয়ে ফেলা হবে। ফ্যামিলি কেয়ার ল্যাব ডায়গনস্টিক সেন্টার এ মালিকানার বিষয়ে তিনি জানান, বিষয়টি সঠিক নয় এমনিতেই ধার হিসেবে কিছু টাকা দিয়েছিলাম মাত্র। সাবেক আওয়ামী লীগ এর প্রভাবশালী এমপি দবিরুল ইসলামের পরিচয় দিয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, দবিরুল এমপির দল কখনোই করিনি, তাদের ক্লিনিকে কাজ করার সুবাধে একটি ভালো সম্পর্ক ছিলো, আমি মূলত ছাত্রদলের নেতা ছিলাম।
এদিকে তার ব্যাক্তিগত ফ্যামিলি কেয়ার ল্যাব এ দেখা যায় রিসিপশন ডেস্ক এ ডা.রহমতুল্লাহ দুপুর ২ টা থেকে রাত ৮ পর্যন্ত প্রতিদিন রোগী দেখেন সম্বলিত একটি প্লেকার্ড। যাতে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে তিনি সরকারি ডাক্তার হিসেবে শুধু সই করে সাইনবোর্ড ব্যবহার করেন। বাকী সময় ব্যক্তিগত ভাবেই উপজেলা ও জেলার বিভিন্ন ক্লিনিকে রোগী দেখা, অপারেশন করার কাজেই ব্যস্ত সময় পার করেন এই ডাক্তার।